ছাত্র অধিকার পরিষদ ভাঙল ॥ নতুন আহ্বায়ক কমিটি

অথর
নিজস্ব প্রতিবেদক   বাংলাদেশ
প্রকাশিত :১৬ অক্টোবর ২০২০, ১২:০৮ পূর্বাহ্ণ | নিউজটি পড়া হয়েছে : 77 বার
ছাত্র অধিকার পরিষদ ভাঙল ॥ নতুন আহ্বায়ক কমিটি

সহকর্মী নারীদের ধর্ষণ, নারী লাঞ্ছনা, ত্রাণের টাকা লুটপাট, ফায়দা লোটার রাজনীতি, আর শীর্ষ কয়েক নেতার স্বেচ্ছাচারিতায় ভেঙ্গে গেল বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। কোটা সংস্কার ও সড়ক আন্দোলনে আলোচিত এ সংগঠন থেকে অপকর্মের জন্য শীর্ষ তিন নেতা নূরুল হক নূর, রাশেদ খান, ফারুক হোসেনকে অবাঞ্ছিত করে ২২ সদস্যের নতুন আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। সহকর্মীর ধর্ষণ মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দিয়েছেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় ও বিভাগীয় পর্যায়ের নেতারা। এদিকে সংবাদমাধ্যমকে হুমকি দেয়া ও নারী ধর্ষণ মামলার ঘটনায় নূরের বিচার দাবি করেছেন সাংবাদিক নেতারা।

নারী ধর্ষণ, নারী লাঞ্ছনা, ত্রাণের টাকা লুটপাট, ফায়দা লোটার রাজনীতি নিয়ে শীর্ষ কয়েক নেতার বিরুদ্ধে ক্ষোভের খবর ক’দিন ধরেই শোনা যাচ্ছিল। ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরসহ ছয় নেতার বিরুদ্ধে এক সহকর্মীকে ধর্ষণ ও ধর্ষণে সহযোগিতার মামলার পর বিরোধ আরও চাঙ্গা হয়। এর জেরেই আসল ভাঙ্গন ও নতুন কমিটির ঘোষণা। সংবাদ সম্মেলন করে ২২ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করে বলা হয়েছে, নূর স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেন, সংগঠনের আর্থিক বিষয়ে অস্বচ্ছতা তৈরি করেছেন। নানা সময় প্রশ্ন করেও জবাব মেলেনি। তাই তারা এই পথে যেতে বাধ্য হয়েছেন। ধর্ষণের শত অপরাধ করেও ফায়দা লোটার রাজনীতি করছেন নূর ও তার সহযোগী অপরাধীরা। সংগঠনটির আগের নাম ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ নামেই নেতৃবৃন্দ এবার নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করেছেন। নূর রাশেদদের সংগঠনের পরিচিত মুখ ও যুগ্ম-আহ্বায়ক এ পি এম সুহেল হয়েছেন নতুন কমিটির আহ্বায়ক। নূর রাশেদদের সংগঠনের আরেক পরিচিত মুখ ও যুগ্ম-আহ্বায়ক এবং ঢাকা কলেজের আহ্বায়ক ইসমাইল সম্রাট হয়েছেন নতুন কমিটির সদস্য সচিব। এছাড়া সাবেক দুই যুগ্ম-আহ্বায়ক মোহাম্মদ উল্লাহ মধু ও মুজাম্মেল মিয়াজি নতুন কমিটির উপদেষ্টার দায়িত্ব নিয়েছেন।

কমিটির যুগ্ম-আহ্বায়ক হয়েছেন মোঃ আমিনুর রহমান (প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক খুলনা বিভাগ, যুগ্ম-আহ্বায়ক কেন্দ্রীয় কমিটি) জালাল আহমেদ (কেন্দ্রীয় যুগ্ম- আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), আব্দুর রহিম (প্রতিষ্ঠাতা সমন্বয়ক সিলেট বিভাগ)। মোঃ আমিনুল হক রুবেল (সাংগঠনিক সম্পাদক সুনামগঞ্জ জেলা এমসি কলেজ)। রিয়াদ হোসেন (যুগ্ম-আহ্বায়ক সরকারী বাংলা কলেজ), মোঃ সেলিম (যুগ্ম-আহ্বায়ক ঢাকা কলেজ), শাকিল আদনান (যুগ্ম-আহ্বায়ক তিতুমীর কলেজ), নাদিম খান নিলয় (সদস্য ঢাকা মহানগর), পৃথু হামিদ (সদস্য ঢাকা মহানগর), একেএম রাজন হোসাইন (সদস্য ঢাকা মহানগর), মোঃ সাইফুল ইসলাম (সদস্য ঢাকা মহানগর), সাজ্জাদুর রহমান রাফি (সদস্য ঢাকা মহানগর), আফরান নাহিদ নিশো (সদস্য ঢাকা মহানগর), জাহিদুল ইসলাম নোমান (যুগ্ম-আহ্বায়ক ঢাকা কলেজ) আর যুগ্ম-সচিবের দায়িত্ব দিয়েছেন সৈয়দ সামিউল ইসলাম (সদস্য, ঢাকা মহানগর)। সদস্য হিসেবে আছেন আগের কমিটির মিজানুর রহমান মুশফিক, মোঃ সিয়াম, মোঃ জুনায়েদ।

নতুন সংগঠনের ঘোষণা দিয়ে আহ্বায়ক এ পি এম সুহেল বলেছেন, ‘মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে মানুষের আবেগ ও বিশ্বাস নিয়ে নোংরা রাজনীতি, নূর-রাশেদদের আর্থিক অস্বচ্ছলতা, স্বেচ্ছাচারিতা, সহযোদ্ধাদের মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে অবমূল্যায়ন করা এবং সম্প্রতি এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর করা ধর্ষণের মামলাকে নোংরা রাজনীতিকীকরণের অপচেষ্টার’ প্রতিবাদে কমিটিতে এই ‘সংস্কার’ করা হয়েছে। তিনি বলেন, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সংগঠনের তৃতীয় বর্ষে পদার্পণের অনুষ্ঠানে সংগঠনের নাম সংক্ষিপ্ত করা হয়, যার বিরোধিতা করেছিলাম আমরা অনেকেই।

ডাকসু’র মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তাড়হুড়ো করে রাজনীতি করার অভিপ্রায়ে বাংলাদেশ যুব অধিকার পরিষদ, শ্রমিক অধিকার পরিষদ ও প্রবাসী অধিকার পরিষদ নামে তিনটি অঙ্গ সংগঠন তৈরি করা হয় ছাত্র অধিকার পরিষদ এর উদ্যোগে। যেখানে এসব সংগঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এখন পর্যন্ত অজানা আমাদের কাছে। এর ফলে সংগঠনের অভ্যন্তরে চাপা ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয় ও এর বিরোধিতা করেন সংগঠনের তৃণমূল থেকে শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ।

কিন্তু একক সিদ্ধান্তে রাজনীতি করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা এক প্রকার স্বৈরতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত এবং সেই সঙ্গে চরম বিরোধ সৃষ্টি করে সংগঠনের অভ্যন্তরে। বিভিন্ন কারণে তরুণদের রাজনীতি বিমুখতায় তারুণ্য নির্ভর এ দলের আত্মপ্রকাশ সত্যি প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু গণমানুষের কথা বলে সাধারণ মানুষের আবেগকে পুঁজি করে, মুখের আড়ালে মুখোশ পরে আছে ভয়ঙ্কর কিছু সত্য, যা সংগঠনের প্রায় সবাই জানে, কিন্তু প্রকাশ করতে চায় না। এমনকি প্রবাসী অধিকার পরিষদ নামে নূর যে সংগঠন বানিয়েছে তার একমাত্র উদ্দেশ্য, আমাদের প্রবাসী ভাইবোনদের কষ্টার্জিত টাকা লোপাট করা।

এদিকে জানা গেছে, সংগঠনের এমন আকষ্মিক ধাক্কায় কোনঠাসা নূর ও তার কয়েক সহযোগী। নূর ও রাশেদ ছাড়া তেমন কোন নেতা প্রকাশ্যে নেই। নতুন কমিটি ঘোষণাকে অবশ্য হাতে লেখা এক বিবৃতিতে আসে, ঘটনাকে সরকারের ষড়যন্ত্র অংশ বলে দাবি করেছেন। দুই নেতাই বলেছেন, ‘আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যম মারফত জানতে পেরেছি যে, বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদ থেকে শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও সংগঠনের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকায় বহিষ্কৃত এপিএম সুহেল বিভিন্ন সংগঠনের কয়েকজনকে নিয়ে বাংলাদেশ ছাত্র অধিকার পরিষদের পূর্ববর্তী নাম ব্যবহার করে একটি কমিটি ঘোষণা করেছে। সেখানে ঐক্যবদ্ধ ছাত্র সমাজের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ উল্লাহ মধু, ঈসমাইল সম্রাট এবং ৩৫ আন্দোলনের একাংশের মুজাম্মেল মিয়াজিসহ কয়েকজনের উপস্থিতি দেখা গেছে। অতীতে আমাদের কিছু সার্বজনীন আন্দোলনে তাদের উপস্থিতি পরিলক্ষিত হলেও, তাদের কেউ আমাদের সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। আমরা মনে করি, তাদের এই কর্মকা- আমাদের পথচলাকে ব্যাহত করতে সরকারের দমন-পীড়ন এবং চলমান ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ মাত্র।’ তবে তাদের এ বক্তব্যের জবাব দিয়েছেন। আহ্বায়ক সুহেল বলেছেন, আসলে এদের বিরুদ্ধে কেউ কিছু বললেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ফোন কল ও মেসেজের মাধ্যমে হুমকি ধামকি দেয়া হয়। ইতোমধ্যে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গেও এমনটা করা হয়েছে। অন্যায় নিয়ে কিছু বললেই এসব ট্যাগ দেয়া হতো তাদের (নূর-রাশেদের) পক্ষ থেকে। এখনও তাই করছে তারা। এটা নতুন কিছু না।

নূরের বিচার দাবিতে প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের মানববন্ধন ॥ সংবাদমাধ্যম নিয়ে কটূক্তি ও হুমকি দেয়ায় ডাকসুর সাবেক ভিপি নূরের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সাংবাদিক নেতারা। জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে নূরের বক্তব্য দ্রুত প্রত্যাহার ও বিচারের দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকায় কর্মরত সংবাদকর্মীরা।

৭১ টেলিভিশনের পক্ষ থেকে নূরকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর ধর্ষণের বিষয়ে টকশোতে অংশ নেয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু তিনি অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান। একাত্তর টিভির যে সাংবাদিক তাকে টকশোতে আমন্ত্রণ জানাতে যোগাযোগ করেছিলেন তার ফোন নম্বর ফেসবুকে ছড়িয়ে দিয়ে নূর গর্হিত অপরাধ করেছেন। প্রতিক্রিয়াশীল একটি চক্র এখন সেই নম্বরে ক্রমাগত কল করে অশ্লীল বক্তব্য ও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। নূরের এই তৎপরতা স্বাধীন গণমাধ্যমের জন্য হুমকিস্বরূপ।

সংবাদটি শেয়ার করুনঃ

শেয়ার করে আমাদের সঙ্গে থাকুন, আপনার অশুভ মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।

আরও পড়ুন